যে স্থাপনার দায়িত্ব নগরবাসীর জন্য বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করা, সেই জায়গাতেই যদি জন্ম নেয় দূষণের উৎস,তাহলে প্রশ্ন উঠবেই। বরিশালের রূপাতলী ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টকে (পানি শোধনাগার) ঘিরে ঠিক তেমনই এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা সামনে এসেছে।
জনস্বার্থে নির্মিত এই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ভেতরেই গড়ে উঠেছে ব্যক্তিগত পশুখামার। আর সেই খামারকে কেন্দ্র করে চলছে দখলদারিত্ব ও ক্ষমতার অপব্যবহার। বরিশাল সিটি করপোরেশনের (বিসিসি) প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন বুধবার প্লান্ট পরিদর্শনে গিয়ে অভিযোগের সত্যতা পান।
সাংবাদিকদের কাছে থাকা ৪৮ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, প্রশাসক শিরীন দুপুর সাড়ে বারোটার দিকে হঠাৎ পানির প্লান্টে পরিদর্শনে যান। সেখানে বেশ কয়েকটি ছাগল তাঁর আশপাশে ঘুরতে দেখা যায়। দায়িত্বরত কর্মচারীকে তিনি জানতে চান, এই ছাগলগুলো কার।
জবাবে ওই কর্মচারী মাথা নিচু করে বলেন, সিইও (প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা) স্যার এগুলো লালন-পালনের জন্য বলেছেন। কথাটি শুনে প্রশাসক কিছুটা থমকে যান। পরে নির্দেশ দেন, ছাগলগুলো দ্রুত প্লান্ট থেকে সরিয়ে নিতে হবে, কারণ অতি শিগগিরই প্লান্টটি উৎপাদনে যাচ্ছে।
প্লান্টের নির্ধারিত জমির একটি বড় অংশ ঘিরে রাখা হয়েছে। সেখানে পালন করা হচ্ছে ছাগল আর ভেড়া। শুধু তাই নয়, পশুখামার টিকিয়ে রাখতে প্লান্টের ভেতরেই করা হয়েছে ঘাস চাষের ব্যবস্থা। সব মিলিয়ে একটি জনকল্যাণমূলক অবকাঠামো কার্যত ব্যক্তিগত ব্যবহারের আওতায় চলে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তবে প্রশাসক সরেজমিনে জাওয়ার আগেই অনেক কিছু সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি এই খামারের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে সিটি করপোরেশনের ভেতরের প্রভাবশালী একটি অংশ। অভিযোগের তীর সরাসরি গিয়ে পড়ছে করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দিকে। যদিও বিষয়টি একাধিক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, পশুগুলো প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তারই। তবে
আরো গুরুতর অভিযোগ হচ্ছে, এই খামার পরিচালনায় ব্যবহার করা হচ্ছে করপোরেশনের বেতনভুক্ত কর্মচারীদের। অন্তত চারজন কর্মচারী নিয়মিত পশুর দেখভাল, খাবার দেওয়া ও পরিচর্যার কাজে নিয়োজিত রয়েছেন, যা সরকারি সম্পদের সুস্পষ্ট অপব্যবহার।
পরিবেশ কর্মী রফিকুল আলম সতর্ক করে বলেছেন, ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টের মতো স্পর্শকাতর স্থাপনায় পশুপালন মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। পশুর বর্জ্য থেকে নির্গত ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও অ্যামোনিয়া বাতাসে ছড়িয়ে শ্বাসতন্ত্রের রোগ ও ত্বকের সংক্রমণসহ নানা জটিলতা বাড়াতে পারে। এর চেয়েও বড় আশঙ্কা হলো, বৃষ্টির পানির সঙ্গে এই বর্জ্য মিশে আশপাশের পানির উৎস দূষিত হয়ে পড়লে তার প্রভাব পড়বে স্থানীয় বাসিন্দাদের ওপর।
প্লান্ট-সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, খামার থেকে ছড়ানো তীব্র দুর্গন্ধে নিত্যদিনের জীবনযাপন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন বর্জ্য অপসারণ না হওয়ায় পরিবেশ পরিস্থিতিও ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। সম্প্রতি বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর পহেলা বৈশাখের রাতেই ভেড়াগুলো সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
বিসিসির আইন উপদেষ্টার দায়িত্বে থাকা সাবেক একাধিক আইনজীবি বলেন, সরকারি প্রকল্পের জমি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা দণ্ডনীয় অপরাধ। সরকারি কর্মচারীদের ব্যক্তিগত কাজে নিয়োজিত করা দুর্নীতির আওতায় পড়ে, যা তদন্তের বিষয় হতে পারে। পরিবেশ দূষণের প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট আইনেও ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
এই পরিস্থিতির মাঝেই আকস্মিকভাবে প্লান্টটি পরিদর্শন করেন প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন। তিনি জানিয়েছেন, বিষয়টি আগে তাঁর জানা ছিল না। তবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
অন্যদিকে অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল বারী বুধবার বিকেলে মুঠোফোনে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ছাগল কিংবা ভেড়া, কিছুই আমার না। এগুলো প্লান্টের পাশের একজনের। তিনি আমার নাম ব্যবহার করে পশুগুলো ভেতরে রেখে লালন-পালন করছিলেন। আমি বলে দিয়েছি দ্রুত সরিয়ে ফেলতে। ভেড়াগুলো ইতিমধ্যে সরানো হয়েছে, ছাগলগুলোও সরিয়ে ফেলা হবে।’
কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি আরো বলেন, এই মাসেই প্লান্ট পরীক্ষামূলক উৎপাদনে গেছে। কয়েকটি পাইপে লিকেজ ধরা পড়েছে। সেগুলো মেরামত করে এই মাসের শেষ নাগাদ পুরোদমে পানি সরবরাহ শুরু হবে।
উল্লেখ্য, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, পানি সরবরাহ প্রকল্পের আওতায় বরিশাল নগরে ২০১৩ সালে দুটি পানি শোধনাগারের নির্মাণ শুরু হয়। উত্তরের বেলতলায় ১৯ কোটি এবং দক্ষিণের রূপাতলীতে ২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে কাজ শেষ হয় ২০১৫ সালের জুনে।
তবে সিটি করপোরেশনের ২৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকা বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকায় ওজোপাডিকো সংযোগ দেয়নি। ফলে শোধনাগার দুটি চালু করা যায়নি। ২০১৮ সালে সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হলেও এখনো তা চালু হয়নি।
https://slotbet.online/