• সোমবার, ১৮ মে ২০২৬, ১০:১৬ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
চাঁদা না পেয়ে ছাত্রদল নেতার হামলায় একজন নিহত, কয়েকজন আহত হয়েছে। মুন্সীগঞ্জে ১৩ বছরের মাদ্রাসাত্রীকে যৌন নির্যাতন,মাদ্রাসা শিক্ষককে আটক করে পুলিশে দিলে স্থানীয়রা ইরান ও প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আগ্রাসনবিরোধী চুক্তি করতে চায় সৌদি আরব নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস। নিখোঁজের ১০ দিন পর মিলল মা-মেয়ের অর্ধগলিত মরদেহ বাকেরগঞ্জে মাদকবিরোধী অভিযানে ৫ জনকে কারাদণ্ড দীর্ঘদিন পালিয়ে থেকেও শেষ রক্ষা হলোনা যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ইউপি সদস্য কালামের বাকেরগঞ্জে ইয়াবাসহ দুই মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার ঝালকাঠির সেই বিতর্কিত দুর্নীতিবাজ উপজেলা প্রকৌশলী ইকবাল কবিরকে হাজীগঞ্জে ঘেরাও, বাথরুমে আশ্রয় নিয়ে রক্ষা বাকেরগঞ্জে ঔষধ চুরির অভিযোগে ফার্মাসিস্ট সাময়িক বরখাস্ত

মুজিবনগর: প্রথম সরকারের জন্মকথা

পথিক / ১১২ পড়া হয়েছে
প্রকাশিত : শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২৬

মুজিবনগর: প্রথম সরকারের জন্মকথা

 

আজ ১৭ এপ্রিল, ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস। বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলার নিভৃত এক আম্রকাননে আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ নিয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে গঠিত এই ‘প্রবাসী’ বা ‘অস্থায়ী’ সরকারের নেতৃত্বেই পরিচালিত হয়েছিল বাঙালির দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ। বৈদ্যনাথতলার সেই আমবাগান সেদিন সাক্ষী হয়েছিল একটি পরাধীন জাতির শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বমানচিত্রে মাথা তুলে দাঁড়ানোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণার।

যেভাবে রচিত হলো পটভূমি

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর বর্বরোচিত হামলা (অপারেশন সার্চলাইট) চালালে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এরপরই তাঁকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। এই চরম সংকটময় মুহূর্তে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন আদায় এবং যুদ্ধ সুচারুরূপে পরিচালনার লক্ষ্যে একটি বৈধ সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।

এরই ধারাবাহিকতায় ১০ এপ্রিল আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠিত হয় এবং স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র (Proclamation of Independence) অনুমোদিত হয়। সিদ্ধান্ত হয়, ১৭ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে এই সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। নিরাপত্তার কারণে ও ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনা করে শপথের স্থান হিসেবে বেছে নেওয়া হয় সীমান্তঘেঁষা মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলাকে।

শথের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ

১৭ এপ্রিল সকাল থেকেই বৈদ্যনাথতলার ভবেরপাড়া গ্রামের আম্রকাননে এক উৎসবমুখর ও টানটান উত্তেজনার পরিবেশ বিরাজ করছিল। সাধারণ গ্রামবাসী স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাত জেগে বাঁশের বাতা দিয়ে বেষ্টনী তৈরি এবং ভাঙা চেয়ার-টেবিল দিয়ে সাদামাটা একটি মঞ্চ প্রস্তুত করেছিলেন। সকাল ১১টার দিকে দেশি-বিদেশি শতাধিক সাংবাদিক ও হাজারো মুক্তিকামী জনতার উপস্থিতিতে শুরু হয় কাঙ্ক্ষিত সেই অনুষ্ঠান।

অনুষ্ঠানের শুরুতে কোরআন তেলাওয়াত করেন পার্শ্ববর্তী গৌরিনগর গ্রামের বাকের আলী এবং বাইবেল পাঠ করেন ভবরপাড়া গ্রামের পিন্টু বিশ্বাস। এরপর স্থানীয় শিল্পীদের কণ্ঠে ‘আমার সোনার বাংলা’ জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম।

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও মন্ত্রিপরিষদ

অনুষ্ঠানে স্বাধীনতাকামী জনতা ও বিশ্বগণমাধ্যমের সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন অধ্যাপক এম ইউসুফ আলী। তিনিই ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও মন্ত্রীদের শপথবাক্য পাঠ করান।

নবগঠিত এই সরকারে পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করা হয়। তাঁর অনুপস্থিতিতে উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এছাড়া ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীকে অর্থ, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়; এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয় এবং খন্দকার মোশতাক আহমদকে পররাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি হিসেবে নিযুক্ত হন কর্নেল (পরবর্তীতে জেনারেল) এম এ জি ওসমানী।

শপথ গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বৈদ্যনাথতলার নাম পরিবর্তন করে বঙ্গবন্ধুর নামে ‘মুজিবনগর’ রাখার ঘোষণা দেন। সেই থেকে এই সরকার ‘মুজিবনগর সরকার’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সালাম ও গার্ড অব অনার
সেদিন আধুনিক কোনো সমরাস্ত্র বা সুসজ্জিত সেনাবাহিনী ছিল না। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে এসডিপিও মাহবুব উদ্দীনের নেতৃত্বে ১২ জন আনসার সদস্য অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন। জীর্ণ পোশাক আর পুরোনো রাইফেল হাতে এই আনসার সদস্যদের দৃপ্ত সালাম সেদিন বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিয়েছিল, বাংলাদেশ কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী নয়, বরং একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে নিজস্ব সামরিক ও প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে তারা লড়ছে।

ইতিহাসের মোড় ঘোরানো অধ্যায়

মুজিবনগর সরকারের শপথ গ্রহণের মাধ্যমে বাংলার মুক্তিসংগ্রাম একটি বৈধ ও আইনগত ভিত্তি লাভ করে। এই সরকারের সুদক্ষ পরিচালনায় সমগ্র যুদ্ধক্ষেত্রকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয় এবং মুক্তিবাহিনীকে সুসংগঠিত করা হয়। ভারতসহ বহির্বিশ্বের সমর্থন আদায়, আন্তর্জাতিক জনমত গঠন, দেশে অবরুদ্ধ মানুষের জন্য ত্রাণ সংগ্রহ এবং সর্বোপরি পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধযুদ্ধকে একটি নিয়মতান্ত্রিক রূপ দিয়েছিল এই সরকার।

প্রথম সরকারের সেই পথচলার চূড়ান্ত পরিণতি আসে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর[3]। মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্বেই সেদিন পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় চূড়ান্ত বিজয়। তাই ১৭ এপ্রিলের সেই আম্রকানন কেবল একটি শপথের মঞ্চ নয়, স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মকথার এক চিরঞ্জীব দলিল হয়ে থাকবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ রকম আরো সংবাদ...
https://slotbet.online/