শেখ হাসিনা সরকারের পতনের ঠিক এক বছরের মাথায় চলতি বছরের জুলাইয়ের শেষে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছিলো, অন্তর্বর্তী সরকার মানবাধিকার রক্ষার চ্যালেঞ্জিং কর্মসূচি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হচ্ছে।
সংস্থাটি তখন তাদের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছিলো, শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনামলে যে ভীতি, দমন-পীড়ন ও গুমের মতো ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটত, তার কিছুটা অবসান ঘটেছে বলে মনে হচ্ছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকার কথিত রাজনৈতিক বিরোধীদের দমনে নির্বিচার আটক করছে। মানবাধিকার সুরক্ষায় তারা এখনো কাঠামোগত সংস্কার আনতে পারেনি।
“উচ্ছৃঙ্খল জনতার সহিংসতা (মব ভায়োলেন্স), রাজনৈতিক সহিংসতা এবং রাজনৈতিক দল ও অন্যান্য চরমপন্থি গোষ্ঠীর বিশেষ করে নারী অধিকার, সমকামী, উভকামী ও ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিবিরোধী ধর্মীয় কট্টরপন্থীদের হাতে সাংবাদিকদের হয়রানি উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে চলছে,” ওই বিজ্ঞপ্তিতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছিলো।
সেই পরিস্থিতির এখনো কোনো উন্নতি হয়নি বলে বলছেন দেশের মানবাধিকার সংগঠক ও সংস্থাগুলো।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত ১০ মাস সময়ে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ২৫৬টি ঘটনায় কমপক্ষে ১৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
“সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার, রাজনৈতিক কর্মী থেকে শুরু করে চোর, ডাকাত, ছিনতাইকারীরা এই সহিংসতার শিকার হয়েছে,” সংস্থাটি তাদের রিপোর্টে বলেছে।
অক্টোবরের শেষে মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’ তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, শেখ হাসিনার শাসনামলের অবসানের পর থেকে রাজনৈতিক সহিংসতায় অন্তত ২৮১ জন নিহত হয়েছেন৷
এছাড়া তাদের হিসেবে, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ২০২৪ সালের ৯ই অগাস্ট থেকে ২০২৫ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অন্তত ৪০ জন বিচারবহির্ভূতভাবে এবং আরও ১৫৩ জনকে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়েছে৷
এসব হত্যাকাণ্ডের অনেকগুলোতে পুলিশ এবং সেনাসদস্যদের জড়িত থাকার সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে অধিকারের প্রতিবেদনে৷
মানবাধিকার সংগঠক সাইদুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলছেন, গত দেড় বছরে মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতির জন্য অনেকাংশ দায়ী ‘কথিত মব’, বিশেষ করে তার মতে- রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং দরগা-মাজার-বাউলদের ওপর হামলা নির্যাতনের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে এই মব।
“সোমবার বাউল শিল্পী আবুল সরকারের জামিন হয়নি আদালতে এবং মানিকগঞ্জের আদালত পাড়ায় একদল আইনজীবী ‘একটা একটা বাউল ধর- ধইরা ধইরা জবাই

নৌ-পুলিশকে উদ্ধৃত করে দেশের সংবাদপত্রে আসা খবর অনুযায়ী, ২০২৪ সালের অগাস্ট থেকে চলতি বছরের অগাস্ট পর্যন্ত এক বছরে শুধু খুলনা অঞ্চলের নদ-নদী থেকে মোট ৫০টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, যার মধ্যে ২০টির পরিচয় পরে প্রকাশ পেয়েছে।
চলতি বছরের অগাস্টেই ঢাকার কেরানীগঞ্জে বুড়িগঙ্গা নদীর আলাদা আলাদা জায়গা থেকে থেকে নারী, শিশুসহ অজ্ঞাতনামা চারজনের লাশ উদ্ধারের ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিলো।এই চার জনের মধ্যে দুজনের হাত বাধা অবস্থায় ছিলো।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর
গত বছর ৮ই আগস্টের পর থেকে চলতি বছর নভেম্বর পর্যন্ত ১৫ মাসে কারা হেফাজতে মারা গেছেন অন্তত ১১২ জন। এর মধ্যে গত বছরের ডিসেম্বরে বগুড়া কারাগারে পরপর চারজন আওয়ামী লীগ নেতার মৃত্যুর ঘটনা তখন আলোচনায় এসেছিলো।
অন্যদিকে এমএসএফ জানিয়েছে, চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত গত এক বছরে তাদের কাছে কারা হেফাজতে ১১৯ জনের মৃত্যুর তথ্য আছে। এছাড়া এই সময়ের মধ্যে পুলিশ হেফাজতে ২১ জন, রাজনৈতিক সহিংসতায় ১০৬ জন ও বিচার বহির্ভূত হত্যার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছে ২৬ জন।
মানবাধিকার সংগঠক সাইদুর রহমান বলছেন, ৫ই আগস্টের আগে উদ্বেগ ছিলো বিচার বিভাগীয় হত্যা, গুম, খুন, রিমান্ডে নির্যাতন, কারা হেফাজতে নিহত হওয়া, অজ্ঞাত লাশ পাওয়া, সভা সমাবেশে বাধা কিংবা ভোট না হওয়া নিয়ে।
“৫ই অগাস্টের পর সবার আশা ছিলো এগুলো কমবে। বাস্তবতা হলো গুম খুন কমলেও অজ্ঞাত মৃত্যু বেড়েই চলেছে। আর সবচেয়ে বেশি মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে মবের দ্বারা। অর্থাৎ মানবাধিকার নিয়ে মানসিকতা, আচরণ ও চর্চায় কোনো পরিবর্তন আসেনি,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মি. রহমান।
নূর খান লিটনও বলছেন, পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে কিন্তু তা প্রতিরোধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ তারা দেখছেন না।
“সারা দেশে হাজার হাজার মামলা হচ্ছে যার সাথে অনেকের যুক্ত থাকার সম্ভাবনা নেই। মামলা নিয়ে বাণিজ্য হচ্ছে। সরকার জেনেও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিচ্ছ না। প্রতিনিয়ত লাশ পাওয়া যাচ্ছে। রাজনৈতিক দলের নামে বাড়িঘর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল হচ্ছে। মামলার খসড়া পাঠিয়ে টাকা দাবির মতো ঘটনা হচ্ছে। বাউল সংস্কৃতি কর্মীরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। সবমিলিয়ে দীর্ঘ স্বৈরশাসনের কুফল ও ফ্যাসিবাদী মনন রয়েই গেছে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল অবশ্য বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, সংস্কারের দিক থেকে মানবাধিকার বিষয়ে অনেকগুলো পদক্ষেপ এ সরকার নিয়েছে, যা পরবর্তী রাজনৈতিক সরকার এসে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে বলে তার বিশ্বাস।
আর সেটি হলে মানবাধিকার সংস্কৃতির ক্রমাগত উন্নতি নিশ্চিত হবে বলে মনে করেন তিনি।
“গুম খুনের মতো মারাত্মক মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলোতে গুরুত্বপূর্ণ অনেক পদক্ষেপ নিয়েছি। গুম সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদে আমরা স্বাক্ষর করেছি। তবে মনে রাখতে হবে মানবাধিকার একটি সংস্কৃতির বিষয়। এটি ওভারনাইট কেউ ম্যাজিক দিয়ে ভালো করতে পারে না,” বলছিলেন আইন উপদেষ্টা।
https://slotbet.online/