অভিযোগ উঠেছে, এনএসএ খলিলুর রহমান সেনাবাহিনীর দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে নিজের পছন্দের ও রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ দুই লেফটেন্যান্ট জেনারেলকে বসিয়ে সেনাপ্রধানকে কোণঠাসা করার গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন।
নর্থইস্ট নিউজের বরাতে জানা গেছে, সেনাপ্রধানের দ্রুত ও কৌশলী হস্তক্ষেপে এই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে। সেনাসূত্রের বরাতে জানা যায়, গত ২১ জানুয়ারি চিফ অব জেনারেল স্টাফ (সিজিএস) লেফটেন্যান্ট জেনারেল মিজানুর রহমান শামীম অবসরে যাওয়ার প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে (এলপিআর) যান। এই পদটি শূন্য হওয়ার সুযোগ কাজে লাগিয়ে এনএসএ খলিলুর রহমান সেনাবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বে একটি নতুন সমীকরণের ছক কষেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এনএসএ চেয়েছিলেন আর্মড ফোর্সেস ডিভিশনের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস এম কামরুল হাসানকে পরবর্তী সিজিএস হিসেবে নিয়োগ দিতে। সিজিএস পদটি সেনাবাহিনীর বাজেট ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে থাকে। একইসঙ্গে কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ ফয়জুর রহমানকে নতুন পিএসও হিসেবে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের অধীনে নিয়ে আসার চেষ্টা ছিল তার।
সূত্রমতে, লেফটেন্যান্ট জেনারেল ফয়জুর রহমান জামায়াতে ইসলামীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এবং লেফটেন্যান্ট জেনারেল কামরুল হাসান এনএসএ খলিলুর রহমানের অত্যন্ত আস্থাভাজন। জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এই রদবদলের সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব আঁচ করতে পেরে দ্রুত হস্তক্ষেপ করেন এবং এই নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত করে দেন। সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি এই রদবদল সফল হতো, তবে ২০২৭ সালের জুনে জেনারেল ওয়াকারের অবসরের পর জেনারেল ফয়জুরের সেনাপ্রধান হওয়ার পথ সুগম হতো, যা সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আনত। জেনারেল ওয়াকার এবং এনএসএ খলিলুরের মধ্যে মতবিরোধ এটিই প্রথম নয়।
২০২৫ সালের এপ্রিলে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই এনএসএ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির জন্য একটি মানবিক করিডোর খোলার প্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার এই প্রস্তাবকে রক্তাক্ত করিডোর আখ্যা দিয়ে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেন এবং সে সময় উদ্যোগটি বাতিল করে দেন।
জানা গেছে, খলিলুর রহমান কাতার ও যুক্তরাষ্ট্রে একাধিক সফর করে আরাকান আর্মি এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেন, যা সেনাবাহিনীর নীতির পরিপন্থী ছিল। এই টানাপোড়েনের জেরে সেনাপ্রধান এমনকি এনএসএ-এর ঢাকা সেনানিবাসে প্রবেশের ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন বলে জানা গেছে।
সূত্রের দাবি, এনএসএ খলিলুর রহমানের নিজস্ব রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষও রয়েছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় এলে তিনি যাতে এনএসএ পদে বহাল থাকতে পারেন, সেজন্য তিনি গত জুন মাস থেকেই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের একটি মাধ্যম বা লাইন অব কমিউনিকেশন চালু রেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভ্যন্তরীণ এই ক্ষমতার দ্বন্দ্বে যখন শীর্ষ নেতৃত্ব ব্যস্ত, তখন পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে নিরাপত্তা পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করছে। প্রতিরক্ষা সূত্রগুলো জানিয়েছে, আরাকান আর্মি এবং মিয়ানমার জান্তা বাহিনীর মধ্যে তীব্র লড়াই চলছে।
এছাড়া আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতাও বেড়েছে। গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমার জান্তা বাহিনী চীনা সিএইচ৩এ মডেলের কমব্যাট ড্রোন ব্যবহার করে পার্বত্য চট্টগ্রামের আলীকদম এলাকাসহ সীমান্তে আরাকান আর্মির ওপর হামলার পরিকল্পনা করছে। এমন পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ডে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বর্তমানে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্বে থাকবেন। তার আগেই তাকে সরিয়ে দেওয়া বা কোণঠাসা করার এই প্রচেষ্টাকে সামরিক বিশ্লেষকরা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখছেন।
https://slotbet.online/