বিদ্যুৎখাতের দুর্নীতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চালানো তদন্তে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অবৈধ আর্থিক লেনদেন বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সন্দেহজনক লেনদেনের প্রমাণ না পাওয়ায় স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়েছে যে, তাঁকে ঘিরে উত্থাপিত অভিযোগগুলো ছিল ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। অন্তর্বর্তী ইউনুস সরকারের গঠিত জাতীয় কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন কার্যত শেখ হাসিনার সততা, স্বচ্ছতা ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীলতার স্বীকৃতিই দিয়েছে।
রোববার রাজধানীর বিদ্যুৎ ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় কমিটির প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশ করা হয়। এর আগে গত মঙ্গলবার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের কাছে প্রতিবেদনটি জমা দেয় কমিটি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, রূপপুর, আদানি ও মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখা হলেও শেখ হাসিনার কোনো ব্যাংক হিসাব বা ব্যক্তিগত আর্থিক কার্যক্রমে অবৈধ লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁকে সরাসরি দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করার যে প্রচেষ্টা দীর্ঘদিন ধরে চালানো হচ্ছিল, তা তদন্তে পুরোপুরি ভ্রান্ত ও বিভ্রান্তিকর প্রমাণিত হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, আদানির সঙ্গে করা চুক্তির কারণে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে, যা সরকারের ওপর বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছে। তবে এই চুক্তি ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও তাতে শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত আর্থিক সংশ্লিষ্টতার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
কমিটির সদস্য ও ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের ফ্যাকাল্টি অব ল অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সের অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান বলেন,
“আদানির চুক্তিতে সাংঘাতিক অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য পাওয়া গেছে। এসব তথ্য আদানিকে জানিয়ে তাদের ব্যাখ্যা চাওয়া উচিত। এরপর দ্রুত সিঙ্গাপুরে চুক্তি সংক্রান্ত সালিশি মামলার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিলম্ব হলে আমাদের মামলা আইনি কারণে দুর্বল হয়ে যেতে পারে। লন্ডনের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এত শক্ত তথ্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ের দুর্নীতি মামলায় বিরল।”
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, চুক্তির সঙ্গে জড়িত সাত থেকে আটজন ব্যক্তির অবৈধ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে, যেখানে কয়েক মিলিয়ন ডলারের আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ট্রাভেল ডকুমেন্টসহ সব তথ্য দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দেওয়া হয়েছে এবং দুদক ইতোমধ্যে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে। তবে তদন্তে শেখ হাসিনার নাম না থাকলেও কারা জড়িত, তা এখনো প্রকাশ করেনি কমিটি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইউনুস সরকার বিদ্যুৎখাতের তদন্তকে ব্যবহার করে শেখ হাসিনার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশল বাস্তবায়নে তৎপর ছিল। কিন্তু জাতীয় কমিটির রিপোর্টই সেই প্রচেষ্টাকে উল্টো ব্যর্থ করে দিয়েছে। কারণ, রিপোর্টে শেখ হাসিনার নাম না থাকাই প্রমাণ করে, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো ছিল রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচারের অংশ।
তদন্তে যদিও কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়ম ও অবৈধ লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে, সেখানে শেখ হাসিনার কোনো সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। বরং প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করে রাজনৈতিকভাবে তাঁকে দায়ী করার একটি অপচেষ্টা ছিল বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০-এর আওতায় হওয়া চুক্তিগুলো পর্যালোচনার জন্য ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর পাঁচ সদস্যের এই জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী। অন্য সদস্যরা হলেন—
বুয়েটের অধ্যাপক আবদুল হাসিব চৌধুরী, কেপিএমজি বাংলাদেশের সাবেক সিওও আলী আশরাফ, বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট জাহিদ হোসেন এবং অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান।
কমিটির কার্যপরিধিতে বলা হয়, তারা যেকোনো উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ, প্রয়োজনীয় নথি নিরীক্ষা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে শুনানিতে আহ্বান এবং চুক্তিতে সরকারের স্বার্থ রক্ষা হয়েছে কি না তা যাচাই করতে পারবে।
সব মিলিয়ে জাতীয় কমিটির এই প্রতিবেদন শুধু শেখ হাসিনাকে নির্দোষ প্রমাণই করেনি, বরং বিদ্যুৎখাতের দুর্নীতির তদন্তকে কেন্দ্র করে তাঁর ওপর দায় চাপানোর যে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র চলছিল, সেটিকেও স্পষ্টভাবে উন্মোচন করেছে।
https://slotbet.online/