মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির জান্তা বাহিনী, আরাকান আর্মি এবং রোহিঙ্গা গ্রুপগুলোর ত্রিমুখি সংঘাতে আতঙ্ক ছড়িয়েছে সীমান্তের এপারে বাংলাদেশেও। সীমান্তের ওপার থেকে আসা গুলি বা গোলায় বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের টেকনাফ এলাকায় গুরুতর আহত হয়েছেন একাধিক বাংলাদেশি, যাদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে।
সোমবার সীমান্ত এলাকায় মাথায় গুলিবিদ্ধ নয় বছরের বাংলাদেশি শিশুটিকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেলের আইসিইউ থেকে ঢাকায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে মেডিকেল বোর্ড।
আর সীমান্ত এলাকায় মাইন বিস্ফোরণে পা হারিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন মোহাম্মদ হানিফ নামে আরেকজন বাংলাদেশি।
বিজিবি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জান্তা বাহিনীর সঙ্গে আরাকান আর্মির লড়াই এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে।
টেকনাফ ও সেন্টমার্টিনের ঠিক উল্টো পাশে মংডু শহর দখলের জন্য বিদ্রোহীরা ব্যাপক হামলা চালাচ্ছে।
এবারের সংঘাতে রোহিঙ্গাদের ছোট ছোট গ্রুপ যুক্ত হওয়ায় ওই এলাকার উত্তেজনায় বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে বলেও জানা গেছে।
এমন পরিস্থিতিতে ঢাকায় নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে মঙ্গলবার তলব করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সীমান্তের ওপার থেকে আসা গুলিতে বাংলাদেশি আহত হওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানানো হয়েছে তাকে।
সীমান্ত এলাকায় বসবাসরত বাংলাদেশিরা বলছেন, টেকনাফের সীমান্ত গ্রামগুলোতে নিয়মিত মর্টার শেল ও ভারী গোলার বিকট শব্দ শোনা যাচ্ছে।
সীমান্তের বর্তমান পরিস্থিতি বেশ অস্থির এবং উত্তেজনাকর বলেও তারা জানান তারা। স্থানীয়রা বলছেন, প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংকট ভয়ের কারণ হয়েছে তাদের জন্য।
ওপার থেকে ছুটে আসা গুলি অথবা সীমান্ত ঘেঁষা এলাকায় পেতে রাখা মাইন আতঙ্কে হোয়াইক্যং, নেপালতলীসহ গ্রামগুলোর বাসিন্দারা।

সীমান্তে তৎপরতা বাড়ানোর কথা জানিয়েছে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি।
গত তিন দিনে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করা ৫৩ জনকে আটক করে পুলিশের হেফাজতে দিয়েছে তারা।
মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংকটের প্রভাব পড়েছে দেশটির সীমান্ত ঘেঁষে বসবাস করা বাংলাদেশিদের ওপর।
মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে কক্সবাজারের টেকনাফ হোয়াইক্যং এলাকার বাসিন্দা নয় বছর বছরের হুজাইফা আফনান।
রবিবার গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয় তাকে।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শিশু হুজাইফাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে।
উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে বলেও জানান চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, অপারেশন করে ওই শিশুর মাথার ভেতরে থাকা গুলি বের করা সম্ভব হয়নি। চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ড উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় পাঠানোর পরামর্শ দিয়েছে।
“বাচ্চাটার অবস্থা আশঙ্কাজনক, আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে আছে। তার মাথার যেখানে গুলিটা আটকে আছে সেটা আমাদের এখানে চিকিৎসা সম্ভব নয় তাই ঢাকার নিউরোসায়েন্সে রেফার করা হয়েছে,” বলেন তিনি।
চিকিৎসকের পরামর্শে শিশু হুজাইফাকে ঢাকায় আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে তার পরিবার। হুজাইফার চাচা মোহাম্মদ শওকত আলী জানান, শুক্রবার থেকেই সীমান্তের ওপারে ভারি গুলিবর্ষণের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলেন তারা।
“আমাদের বাড়ি সীমান্তের পাশেই। রোববার ভোর থেকে গুলির শব্দে শুনছিলাম, পরিবারের সবাই ঘরের মধ্যেই ছিলাম। সকালে ভাইয়ের মেয়ের সঙ্গে কথাও হলো এরপর আমি মাদ্রাসায় চলে গেছি, আধ ঘণ্টা হয় নাই শুনতেছি এই অবস্থা,” বলেন তিনি।
এদিকে, সোমবার টেকনাফের মিয়ানমার সীমান্ত ঘেঁষা এলাকায় মাইন বিস্ফোরণে আহত মাছ ব্যবসায়ী মোহাম্মদ হানিফও চিকিৎসা নিচ্ছেন চট্টগ্রাম মেডিকেলে।
মাইনের আঘাতে মি. হানিফের ক্ষতিগ্রস্ত পা কেটে ফেলতে হয়েছে বলে জানান তার ভাই আনোয়ারুল ইসলাম।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, “আমগো তো কোনো নিরাপত্তা নাই ভাই, আমরা কি করতাম। বাড়ি ছাইড়া কই যামু, আমার ভাইর পা ডাই তো কাইটা ফেলা লাগলো।”
আরাকান আর্মি এবং মিয়ানমার নৌ বাহিনীর পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে এমনিতেই গত কয়েক মাস যাবৎ নাফ নদী কিংবা সমুদ্রের সীমান্ত সংলগ্ন অংশে অস্থিরতা চলছে বলে জানান হোয়াইক্যং মডেল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহ জালাল।
তিনি জানান, মিয়ারমানের ভেতরে গুলির শব্দ শুনলেই আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন তারা। মাঝেমধ্যেই গুলি এবং মর্টার শেল বাংলাদেশ সীমান্তের ভেতরে এসে পড়ছে।
“সীমান্তে বিজিবির উপস্থিতি আছে তবে পুরো এলাকায় তো তারা সবসময় থাকে না। ওপার থেকে অনেক সময় গুলির শব্দ পাই আবার দেখি মাঝেমধ্যে অনেকে এপারে চলে আসে,” সময় ডট কম কে বলেন তিনি।
https://slotbet.online/