শীতকালে কখনো কখনো এমন দিন আসে যখন সহজে সূর্যের আলো দেখা যায় না। কারণটা হলো ধূসর রঙা ঘন কুয়াশার চাদর। তখন কয়েক হাত দূরত্বেই আমাদের দৃষ্টিসীমা আটকে যায়। কুয়াশা ভেদ করে কিছুই স্পষ্ট দেখা যায় না।
প্রতিবছর শীতের সময়ে একাধিক দিন এরকম দৃশ্য দেখা যায়।
এমনকি ঘন কুয়াশার কারণে যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন, সড়কে দুর্ঘটনা, বিমান ওঠানামা স্থগিত, ফেরি বা নৌযান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়ার উদাহরণও রয়েছে।
কিন্তু কুয়াশা আসলে কী, কীভাবে এবং কেন এটি তৈরি হয়? শীতেই কেন এর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি হয়? আবহাওয়ার ওপর এটি কী ধরনের প্রভাব ফেলে?
আবহাওয়াবিদরা কুয়াশাকে ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি তৈরি হওয়া এক ধরনের নিচু মেঘ বা ‘লো ক্লাউড’ হিসেবে বর্ণনা করেন। কুয়াশা তৈরির পেছনে বাতাসের আর্দ্রতা ও তাপমাত্রার পার্থক্য দায়ী থাকে।
অন্য সময়ের তুলনায় শীতকালেই কুয়াশার প্রবণতা বেশি দেখা যায়।
কারণ শীতকালে তাপমাত্রা কম থাকায় মাটিতে থাকা আর্দ্রতা ধীরে ধীরে উপরে উঠে আসে এবং বাতাস শিশিরাঙ্কে পৌঁছালে, অর্থাৎ ঠান্ডা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা ক্ষুদ্র জলকণায় রূপ নেয়।
এই জলকণাগুলো বাতাসে ভেসে থাকলেই কুয়াশা তৈরি হয়।
দিনে সারফেসে যা তাপমাত্রা আসে, রাতে তা চলে যায়। কোনও কারণে সারফেস দ্রুত ঠাণ্ডা হয়ে গেলে, অর্থাৎ উপরের তাপমাত্রার চেয়ে নীচের তাপমাত্রা কম হলে কুয়াশা তৈরি হয়,” বলছিলেন বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ড. মো. বজলুর রশিদ।
কুয়াশা তৈরির আরেকটি ধরন হলো অ্যাডভেকশন ফগ। যখন তুলনামূলকভাবে উষ্ণ ও আর্দ্র বাতাস ঠান্ডা ভূপৃষ্ঠের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়, তখন এটি তৈরি হয়।
এই ক্ষেত্রে কুয়াশা মাটির ওপর স্থির না থেকে কিছুটা ভেসে বেড়ায়।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, পৌষ মাসে বা পৌষ মাসের শেষে কুয়াশা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে ঘন কুয়াশা তৈরির পেছনে কিছু কারণ রয়েছে এবং ২০০০ সালের পর থেকে এটি ক্রমশ বাড়ছে।
ঘন কুয়াশার কারণে দিন-রাতের তাপমাত্রা কমে যাচ্ছে উল্লেখ করে আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ বলেছেন, “কুয়াশাচ্ছন্ন অবস্থা প্রচুর বেড়েছে। আগে এরকম ছিল না।”
“গত ২৯শে ডিসেম্বর দিন রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য এক দশমিক সাত ছিল, আমি গত ২০ বছরেও এমনটা দেখিনি। আর এই ঘটনা শুধু এবার না, প্রতিবছর হচ্ছে।”
তিনি মনে করে, ঘন কুয়াশার মূল কারণ দূষণ। যানবাহন, ইটভাটা ও শিল্প-কারখানার দূষিত ধোঁয়ার পাশাপাশি নির্মাণকাজের সংখ্যা বৃদ্ধিসহ নানান দূষণ এখন বেশি।
“তবে এর পেছনে আরও কিছু বিষয় রয়েছে। মেটেরোলজিক্যাল প্যারামিটারেও পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তনের জন্যঅই এবার এখনও পশ্চিমা লঘুচাপ আসেনি। আর এটা হচ্ছে গ্লোবাল ওয়ার্মিং ও স্থানীয় কারণে,” বলছিলেন মি. বজলুর।
তিনি আরও জানান, কুয়াশা তৈরির জন্য প্রথমে “মাইক্রো লেভেলের পার্টিকেল” লাগে।
“কোনও কারণে যদি তা পলিউশন পার্টিকেল হয়, তখন তা ফগ ফর্মেশনের জন্য ট্রিগার করে। অর্থাৎ এটি কুয়াশা বাড়াতে সহায়তা করে,” যোগ করেন এই আবহাওয়াবিদ।
উল্লেখ্য, এশিয়া মহাদেশে বাংলাদেশ ও ভারতে ঘন কুয়াশা বেশি হয়। পাকিস্তানে কুয়াশা হলেও ঘন কুয়াশা কম হয় বলে বিভিন্ন সময়ে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছে আবহাওয়াবিদরা।
ছবির উৎস,Getty Images
যখন কুয়াশার কারণে দৃষ্টিসীমা এক হাজার মিটারের নীচে নেমে আসে, কুয়াশার তীব্রতা বেশি থাকে, তখন সাধারণত বাংলাদেশে ফগ অ্যালার্ট জারি করা হয়।
এ ধরণের সতর্কবার্তার মাধ্যমে মূলত যানবাহন চলাচলে বিশেষ সতর্কতা নিতে বলা হয়।
বিশেষ করে, নদী তীরবর্তী এলাকাগুলোয় কুয়াশার তীব্রতা বেশি থাকে। কুয়াশার কারণে যেহেতু বেশি দূর পর্যন্ত দেখা যায় না, ফলে নৌযানগুলোর মাঝে সংঘর্ষের ঝুঁকি বেশি থাকে। নদীতে যেসব যাত্রী বা পণ্যবাহী যান চলাচল করে, সেগুলোর জন্য এই ঝুঁকি আরও বেশি থাকে।
কুয়াশার সময় শুধু নৌপথ না, সড়ক পথ, রেলপথ কিংবা আকাশ পথও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সেইসাথে, কুয়াশা শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে শরীরে ঢুকলে নানা ধরনের স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি হয়। এর মাঝে ফুসফুসের সমস্যা ও এলার্জিজনিত রোগের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
তাই, কুয়াশার মধ্যে বাইরে বের হলে অবশ্যই মাস্ক পরে বের হওয়ার পরামর্শ দেন চিৎসকরা।
এছাড়া, সূর্যের কিরণ গাছপালায় পৌঁছাতে না পারায় পাতায় সালোক-সংশ্লেষণের পরিমাণ কমে যায়। এতে একদিকে গাছের খাদ্য কম পরিমাণে তৈরি হয়ে এবং গাছ পুষ্টি কম পায়, অন্যদিকে একই কারণে অক্সিজেনের উৎপাদনও কমে যায়। এসময় রবি শস্যের উৎপাদনও কমে যায়।
https://slotbet.online/