বানিয়াচং থানা ও এস আই সন্তোষ চৌধুরীকে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা সম্পর্কে হবিগঞ্জের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা মাহদী হাসানের বক্তব্য নিয়ে সমালোচনার মুখে তাকে গ্রেফতার করা হয়। তবে সেই গ্রেফতারের প্রতিবাদে তার সমর্থকদের বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে তাকে মুক্তি দেওয়া হলে তা নিয়েও চলছে নানা আলোচনা সমালোচনা।
যদিও মাহদী হাসানকে আদালত জামিন দিয়েছে। কিন্তু মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবীদের অনেকে পুরো ঘটনার বিশ্লেষণে আইনের শাসনের প্রশ্ন তুলেছেন।
মাহদী হাসান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক।
গতকাল শনিবার তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এরপরই ঢাকা ও হবিগঞ্জে বিক্ষোভ কর্মসূচি শুরু করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সদস্যরা। পরে রোববার সকালে আদালতে হাজির করা হলে তার আবেদনের প্রেক্ষিতে জামিন দেয় হবিগঞ্জের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত।
গত দোসরা জানুয়ারি মি. হাসানের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
সেই ভিডিওতে দেখা যায়, শায়েস্তাগঞ্জ থানায় বসে প্রকাশ্যেই মি. হাসান ওসি আবুল কালামকে হুমকি দিচ্ছেন এই বলে যে, তারা বানিয়াচং থানা পুড়িয়েছেন এবং এস আই সন্তোষ চৌধুরীকে জ্বালিয়ে দিয়েছেন।

ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর মানুষের ব্যাপক সমালোচনার মুখে শনিবার বিকেলে মাহদী হাসানকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
ওইদিন সন্ধ্যা থেকে তার মুক্তির দাবিতে দাবিতে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতা-কর্মীরা থানার সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন। ঢাকাতেও কেন্দ্রীয়ভাবে বিক্ষোভ সমাবেশ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। তাকে মুক্তি দিতে আলটিমেটামও দিয়েছিল সংগঠনটি থেকে।
রোববার এই সংগঠনের পক্ষ থেকে দাবি জানানো হয়েছে, শুধুমাত্র জামিন নয়, মাহদীকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে। সেই সাথে জুলাই অংশগ্রহণকারী সবাইকে পহেলা জুলাই থেকে ৮ই অগাস্ট পর্যন্ত সব কর্মকাণ্ডের জন্য দায়মুক্তি দিয়ে অধ্যাদেশ জারি করতে হবে।
কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, থানায় বসে প্রকাশ্যে ওসিকে হুমকি এবং মানুষ পুড়িয়ে মারার দাবি করার পরও কেন ওইদিনই মি. হাসানকে গ্রেফতার করেনি পুলিশ? শেষপর্যন্ত তাকে গ্রেফতার করা হলেও প্রতিবাদ কতটা যুক্তিসঙ্গত?
এছাড়া বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে তার মুক্তি বাংলাদেশে আইনের শাসনের দুর্বলতা কি না, এমন প্রশ্ন আলোচনায় এসেছে।
যেটা বলা হয় যে, আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগের যাদেরকে ধরার জন্য বলা হয়, তাদেরকে কমিটি দেখে ধরা হয় ” বলেন মি. কালাম।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতা মাহদী হাসান জানান, ছাত্রলীগের সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তাদের তিন জন কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
আবু ফজল নামে একজন এখনো কারাগারে রয়েছেন বলে জানান তিনি।
থাকলে কেবলমাত্র কথার ভিত্তিতে কাউকে আটক করা যায় না।
যদি কোনো ব্যক্তি ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন তাহলেই তা আমলে নিয়ে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে বলে জানান আইনজীবী মি. মালিক।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতা মি. হাসান পুলিশের সাথে কথোপকথনের একপর্যায়ে এ কথা বলেছেন।
তাই এটি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি হিসেবে গণ্য হবে না বলে মনে করেন তিনি।
“এটা আইনের চোখে অতটা গুরুত্বপূর্ণ না হলেও সার্বিকভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য মোটেও সহায়ক নয়,” বলেন আইনজীবী শাহদীন মালিক।
ছবির উৎস,Screen Grab
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বৈষম্যবিরোধী নেতা মাহদী হাসানের ‘স্বীকারোক্তি’ ও গ্রেফতারের পরে মুক্তির দাবিতে শনিবার সন্ধ্যা থেকে রাতভর তার নেতা-কর্মীদের থানার সামনে বিক্ষোভের ঘটনা প্রমাণ করে দেশে আইনের শাসন একেবারেই দুর্বল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বিবিসি বাংলাকে বলেন, “এ ধরনের পরিস্থিতি বা বাস্তবতার কাছে যদি আইনের শাসন সবসময় পদাবনত বা অবনত থাকে বা এটাকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, তখন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা বা আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা থাকবে না”।
এই ঘটনা কেবলমাত্র একটি ঘটনাই নয় বরং ঘটনাটির অন্তর্নিহিত প্রভাব অনেক ব্যাপক বলে মনে করেন মি. হক।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য মানতে না চাওয়ার কারণেই ক্ষমতার বলয়ে থাকা ব্যক্তিরা যা খুশি তাই করতে চায়। ফলে দেশে আইনের শাসন নেই বলেই ধারণা হয় সাধারণ মানুষের।
সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বিবিসি বাংলাকে বলেন, ” আমরা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলছি কিন্তু আইনি সংস্কৃতি তৈরি করা বা আইন মান্যকারী পরিবেশ বা জনগোষ্ঠী তৈরি করা এই বৈশিষ্ট্যগুলো আসলে আমরা মানতে চাচ্ছি না।”
মি. হক মনে করেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতা মি. হাসান ঘরোয়া কোনো পরিবেশে পুলিশকে পুড়িয়ে মারার কথা বলেননি, বরং যে পরিবেশে বলেছেন, তা ১৬৪ ধারার চেয়ে কোনো অংশে কম না।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন সময় দলটির অঙ্গসংগঠনগুলোর এ ধরনের প্রভাব খাটানোর নজির দেখা গেছে।
পাঁচই অগাস্টের পরে বিভিন্ন জায়গাতে সমন্বয়ক পরিচয় দিয়ে চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে মবোক্রেসির মতো নানা ধরনের অপরাধ হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ” এখন সেই জায়গাতে এসে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তাপ সৃষ্টির প্রচেষ্টা বা নিজেদের অনুকূলে সিদ্ধান্ত না দিলে মানুষের ভোগান্তি সৃষ্টি করে নিজের পক্ষে সিদ্ধান্ত নিয়ে আসার যে অগণতান্ত্রিক প্রচেষ্টা, যারা চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদের মধ্যে কেউ কেউ যখন এ ধরনের মন্তব্য করেন তখন এ ব্যাপারগুলো নিয়ে মানুষের মধ্যে নানারকম প্রশ্ন যেমন তৈরি হয়, তখন এটাও তৈরি হয় যে আদৌ কোনো পরিবর্তন আসবে কি না? “
রাজনৈতিক পালাবদল ঘটলেও ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রভাব খাটানোর মতো একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি বারবার ঘটছে বলে উল্লেখ করেন অধ্যাপক মি. হক।
এ বিষয়ে কথা হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার, শায়েস্তাগঞ্জ থানা ও বানিয়াচং থানার ওসিসহ অন্তত চারজনকে ফোন করা হলেও রিসিভ করেননি তারা।
পরে পুলিশ সদর দফতরের মিডিয়া অ্যান্ড পিআর উইংয়ের এআইজি এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইনের মোবাইলে ফোন করলেও রেসপন্স করেননি তিনি।
https://slotbet.online/