জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি এখন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বিতর্কের কেন্দ্রে। ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হলেও এটি এখনও কার্যকর হয়নি। উভয় দেশের অভ্যন্তরীণ অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন এবং আনুষ্ঠানিক নোটিফিকেশন বিনিময়ের ৬০ দিন পর চুক্তিটি কার্যকর হবে। অর্থাৎ স্বাক্ষরের কয়েক সপ্তাহ বা মাস পরও এর বাস্তবায়ন শুরু হতে পারে।
এই চুক্তিকে কেন্দ্র করে মূল প্রশ্ন হলো—নতুন সরকার কি এটি অনুমোদন করবে, নাকি পুনরায় আলোচনা শুরু করে মালয়েশিয়া ও কম্বোডিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মতো তুলনামূলকভাবে নমনীয় ও নিয়মভিত্তিক কাঠামোর দিকে যাবে।
মালয়েশিয়া ও কম্বোডিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি যেখানে “ফ্রেমওয়ার্ক-স্টাইল”, নিয়মভিত্তিক এবং তুলনামূলকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ, সেখানে বাংলাদেশের প্রস্তাবিত কাঠামোটি অধিক শর্তযুক্ত ও বাধ্যবাধকতানির্ভর বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।
শুল্ক ও বাজার প্রবেশাধিকার
চুক্তি অনুযায়ী প্রায় ৭,১৩২টি মার্কিন পণ্য বাংলাদেশে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। অন্যদিকে বাংলাদেশের পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত সর্বোচ্চ শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশে নামানো হয়েছে। নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে—বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত তুলা বা কাঁচামাল ব্যবহার করলে—কিছু পণ্য সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত সুবিধাও পেতে পারে।
তবে সমালোচকদের মতে, শুল্ক হ্রাসের এই সুবিধা শর্তযুক্ত এবং বিশেষ করে বস্ত্রখাতে মার্কিন কাঁচামাল ব্যবহারের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এটি প্রকৃত মুক্ত বাণিজ্যের পরিবর্তে শর্তাধীন সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ধারা ৩: ডিজিটাল বাণিজ্য
ডিজিটাল সেবার ওপর কোনো শুল্ক আরোপ করা যাবে না। এর ফলে মার্কিন ডিজিটাল কোম্পানিগুলো সরাসরি সুবিধা পাবে। যদিও এটি প্রযুক্তি ও সেবা খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে পারে, তবে স্থানীয় নীতিনির্ধারণী ক্ষমতা সীমিত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
ধারা ৪: অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা
এই ধারাটিই সবচেয়ে বিতর্কিত।
অনুচ্ছেদ ৪.১ ও ৪.২ অনুযায়ী, বাংলাদেশ যদি এমন কোনো দেশের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাণিজ্য করে যারা “বাজারমূল্যের নিচে” পণ্য বিক্রি করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ব্যবস্থা নিতে পারবে। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, বাংলাদেশকে তা কার্যকরভাবে অনুসরণ করতে হবে।
সম্ভাব্য প্রভাব:
চীনসহ অন্যান্য দেশ থেকে কম দামে কাঁচামাল আমদানিতে বাধা সৃষ্টি হতে পারে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও বাণিজ্যিক অংশীদার নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে আবদ্ধ হয়ে যেতে পারে।
স্বাধীন অর্থনৈতিক কূটনীতির ক্ষেত্র সংকুচিত হতে পারে।
অনুচ্ছেদ ৪.৩: পারমাণবিক শক্তি ও প্রতিরক্ষা
এই ধারা অনুযায়ী, বাংলাদেশ এমন কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক প্রযুক্তি বা জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারবে না, যারা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের পরিপন্থী। এর ফলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো প্রকল্পের ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণে রাশিয়া বা অনুরূপ অংশীদারদের সম্পৃক্ততা জটিল হয়ে উঠতে পারে। এটি জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
ধারা ৫: বাধ্যতামূলক ক্রয়
এই ধারা চুক্তির সবচেয়ে আলোচিত অংশগুলোর একটি।
অনুচ্ছেদ ৫.১ ও ৫.২: যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশের খনিজ, গ্যাস ও টেলিযোগাযোগ খাতে অবাধ প্রবেশাধিকার দিতে হবে।
অনুচ্ছেদ ৫.৩: বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে তখনই, যখন নির্দিষ্ট পরিমাণ মার্কিন তুলা আমদানি করা হবে।
অনুচ্ছেদ ৫.৪ ও সংযুক্তি-৩ অনুযায়ী বাংলাদেশকে নিম্নলিখিত ক্রয় লক্ষ্য পূরণের চেষ্টা করতে হবে:
বিমান: বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে ১৪টি বোয়িং বিমান ক্রয়
জ্বালানি: ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন এলএনজি আমদানি
কৃষিপণ্য: প্রতিবছর ৭ লাখ টন গম, ১.২৫ বিলিয়ন ডলারের সয়াবিন এবং ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের তুলা আমদানি
সমালোচকদের মতে, এসব শর্ত মুক্ত বাজারনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়; বরং নির্দিষ্ট মার্কিন কোম্পানির জন্য নিশ্চিত বাজার তৈরি করে।
ধারা ৬: বাস্তবায়ন ও প্রয়োগ
অনুচ্ছেদ ৬.৪ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র যদি মনে করে বাংলাদেশ কোনো শর্ত পূরণ করছে না, তাহলে তারা পুনরায় উচ্চ শুল্ক আরোপ করতে পারবে। এখানে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সরাসরি কোনো বিরোধ নিষ্পত্তি কাঠামো যুক্ত নয়। ফলে প্রয়োগক্ষমতা একতরফাভাবে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়
চুক্তির আওতায় নির্দিষ্ট পরিমাণ মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম কেনার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা খাতে মার্কিন প্রযুক্তিনির্ভরতা বৃদ্ধি পেতে পারে।
তুলনামূলক প্রেক্ষাপট
মালয়েশিয়া ও কম্বোডিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তিগুলোতে নিয়মভিত্তিক কাঠামো, পারস্পরিকতা এবং WTO-সামঞ্জস্যপূর্ণ বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থার উল্লেখ রয়েছে। সেখানে বাধ্যতামূলক ক্রয় বা একতরফা প্রয়োগ ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে সীমিত।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত চুক্তিতে:
বাধ্যতামূলক আমদানি লক্ষ্য নির্ধারণ
নিষেধাজ্ঞা অনুসরণে বাধ্যবাধকতা
জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে নীতিগত সীমাবদ্ধতা — এই বিষয়গুলো তুলনামূলকভাবে কঠোর কাঠামোর ইঙ্গিত দেয়।
https://slotbet.online/